গীবত
❒ এক,আমরা যখন কারো প্রশংসা করি তখন প্রশংসা করতে করতে তাকে আকাশে তুলে দেই! আবার কারো সমালোচনা করতে বসলে তার দুর্নাম করতে করতে পাতালে ডুবিয়ে দেই! ইসলামের দৃষ্টিতে দুটোই নিন্দনীয়। মানুষের ভালো-খারাপ গুণাগুণ থাকতেই পারে। দোষ-গুণ মিলেই মানুষ। তাই কোনো মানুষ সম্পর্কে কথা বলতে হলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রশংসা করতে হলে মনে রাখতে হবে যে, কারো উপস্থিতিতে তার সম্মুখে প্রশংসা করা অনুচিত। প্রশংসা করতে হবে তার অনুপস্থিতিতে। আবার কারো সমালোচনা করাও একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ। আরবীতে যাকে "গীবত" বলা হয়!
.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা বলেন,
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
‘আর তোমরা কেউ কারো গীবত করো না, তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? একে তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে।
[সূরা হুজুরাত: ১২]
.
আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟» قَالُوا: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ، فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ
তোমরা কি জান, গীবত কি? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন:
“গীবত হল তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কিছু আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে।”
প্রশ্ন করা হল: আমি যা বলেছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থেকে থাকে, তাহলে আপনি কি বলেন?
তিনি বললেন: “তুমি তার সম্পর্কে যা বলেছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তো তুমি তার প্রতি অপবাদ আরোপ করলে।”
📚 [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-২৫৮৯]
.
❒ দুই,
■ গীবত থেকে বেঁচে থাকতে সালাফগণের প্রচেষ্টাঃ
ইবনু মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ ) বলতেন,
‘আমি যদি কারো গীবত করতাম তবে অবশ্যই আমি আমার পিতা-মাতার গীবত করতাম। কারণ তারাই আমার নেকী পাওয়ার বেশী হক্বদার’
📚 [আমসিক আলায়কা লিসানিকা, ৫৮-৫৯]
.
ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ (৯৩-১৭৯ হি.)-এর নিকটে বিশ বছর অধ্যয়নকারী ছাত্র আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াহাব (১২৫-১৯৬ হি./৭৪৩-৮১২ খৃ.) বলেন,نَذَرتُ أَنِّي كُلَّمَا اغْتَبْتُ إِنْسَاناً أَنْ أَصُوْمَ يَوْماً فَأَجْهَدَنِي فَكُنْتُ أَغْتَابُ وَأَصُوْمُ، فَنَوَيْتُ أَنِّي كُلَمَّا اغْتَبتُ إِنْسَاناً أَنْ أَتَصَدَّقَ بِدِرْهَمٍ فَمِنْ حُبِّ الدَّرَاهِمِ تَرَكتُ الغِيْبَةَ ‘
একবার আমি শপথ করলাম যে, কারো গীবত করলেই আমি একদিন ছিয়াম রাখব। কিন্তু এটা আমাকে খুব কষ্টে ফেলল। এরপরেও আমি গীবত করতাম ও ছিয়াম রাখতাম। অতঃপর আমি নিয়ত করলাম যে কারো গীবত করলেই একটি করে দিরহাম ছাদাক্বা করব। (এবার এতে কাজ হ’ল) ফলে দিরহামের ভালোবাসায় আমি গীবত ছেড়ে দিলাম
📚 [যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৮/১৫]
.
❒ তিন,
এক মুমিন আর এক মুমিনের ভাই, তারা পরস্পরে একে অপরের শক্তি যোগায়। এই স্পিরিটকে সামনে রেখেই পরস্পরের ভুলত্র“টি শোধরানোর আন্তরিক প্রচেষ্টাই পারস্পরিক "মুহাসাবা" নামে অভিহিত। এখানে সংশোধন কামনা, নিজের ভাইকে দুনিয়া, আখেরাতের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা,উন্নতি ও কল্যাণের পথে চলতে সাহায্য করাই মুখ্য। যার অনিবার্য দাবী হল, নিজের মনকে সবার কল্যাণ কামনায় ভরপুর রাখতে হবে। মনে সবার জন্যে অকৃত্রিম দরদের অনুভূতি থাকতে হবে। সবার উন্নতি অগ্রগতির কামনা করে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়ার অভ্যাস থাকতে হবে। ভাইদের সামগ্রিক তৎপরতা ও চরিত্রে ভাল দিকগুলোর যথার্থ স্বীকৃতি থাকতে হবে। এই কারণে তারা যতটা শ্রদ্ধাবোধের দাবী রাখে নিজের মনে ততটা শ্রদ্ধাবোধ অবশ্যই রাখতে হবে। তাহলেই কেবল মুহাসাবা করার মুহূর্তে ইনসাফ করা এবং সীমা লঙ্ঘনের মত দুর্বলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। হাদীছে এক মুমিনকে অপর মুমিনের জন্যে আয়নাস্বরূপ বলা হয়েছে। আয়নার ভূমিকা হলঃ
⦁ আমার চেহারায় কোথায় কি আছে আমি দেখতে পাই না, আয়না আমাকে দেখিয়ে দেয়।
⦁ এই দেখবার ক্ষেত্রে আয়না তার নিজের দিক থেকে কিছুই বাড়িয়ে বা অতিরঞ্জিত করে দেখায় না। আবার কমও দেখায় না।
⦁ আমি যতক্ষণ আয়নার সামনে থাকি ততক্ষণই সে আমার দোষ ত্রুটি টি আমাকে দেখায়। আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে সে এটা দেখায় না বা বলাবলি করে না।
অনুরূপভাবে আমিও নিজের ত্রুটি বিচ্যুতি জানবার জন্যে অন্য ভাইকে একটা উত্তম অবলম্বন মনে করব। এই ত্রুটি দেখাতে গিয়ে আমরা বাড়াবাড়ি করবো না। সর্বত্র এই নিয়ম-নীতির অনুসরণের মাধ্যমেই আমরা সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যের সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে তুলে আল্লাহর ভালবাসার পাত্র হতে পারব।
.
❒ চার,
"গীবত করা বা পরনিন্দা করা হারাম"এই কথাটা একজন সাধারন মুসলমানও জানে। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে গীবত করা শুধু "যায়েজ ই নয় বরং ওয়াজিব "এই কথাটা অনেকেই জানেন না। যারফলে গীবতকারী, গীবতকারী বলে চিল্লাফাল্লা করেন!
কিছু মানুষ এমন আছে যে, সে নিজে খারাপ (বদ চরিত্রের লোক) কিন্তু তার কারণে অন্যলোক ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এমন লোকের অনুপস্থিতিতে তার নিন্দা করা যাবে না। করলে সেটা 'গীবত' হবে।
কিছু লোকের চরিত্র এমন যে, সে নিজেও ধ্বংস হয়েছে এবং অন্যকেও ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে (!) এমন লোকের ধ্বংসাক্তক ছোবল থেকে অন্যকে বাচানোর উদ্দেশ্যে তার খারাপ চরিত্রের কথা মানুষকে জানিয়ে দেওয়া গীবতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
যেমন ধরূন আপনার এলাকাতে একজন প্রসিদ্ধ ডাকাত আছে, তাহার ভাষা খুবই মিষ্টি! সে মিষ্টি কথার দ্বারা মানুষকে বশিভুত করে ফেলে এবং সুযোগ ফেলে কৌশলে মানুষের অনিষ্ট করে। এমতাবস্তায় আপনি দেখলেন যে, আপনার ঘনিষ্ট একজন আত্নীয় তার খপ্পরে পড়ে যাবার উপক্রম!
এখন আপনি কি করবেন ? গীবত করা হারাম তাই চুপ করে বসে থাকবেন?
আপনার একান্ত কর্তব্য হল, ছদ্মবেশী ডাকাতের চরিত্রকে জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করে দেওয়া! যদি না করেন তাহলে আপনার আত্নীয়ের সবকিছু ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে! সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আরও বহু মানুষ! এই হল সাধারন ব্যাপার। এরকম বিশেষ কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে গীবত করা ওয়াজিব! যথাঃ
(১) অত্যাচারীর অত্যাচার প্রকাশ করার জন্য!
(২) সমাজ থেকে অন্যায় দূর করা এবং পাপীকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য!
(৩) হাদীছের সনদ যাচাইয়ের জন্য!
(৪) মুসলিমদেরকে মন্দ থেকে সতর্ক করার জন্য!
(৫) পাপাচার ও বিদ‘আত থেকে সাবধান করার জন্য!
(৬) প্রসিদ্ধ নাম বলে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য যাদের দ্বারা উম্মাহ বিভ্রান্ত হচ্ছে বা হয়েছে!
📚 [নববী, রিয়াযুছ ছালেহীন, ২৫৬ অনুচ্ছেদ, পৃঃ ৫৭৫; মুসলিম হা/২৫৮৯ ‘গীবত হারাম হওয়া’ অনুচ্ছেদ, নববীর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য]
এই হল ছয়টি ক্ষেত্র, যার ভিত্তিতে গীবত করা বৈধ। আর এর অধিকাংশ সর্বসম্মত। সহীহ হাদিস থেকে এর বিভিন্ন দলীলও প্রসিদ্ধ। যথাঃ
.
১ম বক্তব্য,
একদা মু‘আয (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) সালাত দীর্ঘ করলে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ফিতনাহ সৃষ্টিকারী, ফিতনাহ সৃষ্টিকারী, ফিতনাহ সৃষ্টিকারী!”
[সাহীহ বুখারী, হা/৭০১; সাহীহ মুসলিম, হা/৪৬৫]
·
২য় বক্তব্য,
রাসূলুল্লাহ ﷺ আবূ জাহম (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)’র ব্যাপারে বলেছেন, “আবূ জাহম এমন লোক, যে তার কাঁধ থেকে লাঠি নামিয়ে রাখে না।”
[সাহীহ মুসলিম, হা/১৪৮০; ‘ত্বালাক্ব’ অধ্যায়; পরিচ্ছেদ- ৬]
·
৩য় বক্তব্য,
রাসূলুল্লাহ ﷺ মু‘আউয়িয়াহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)’র ব্যাপারে বলেছেন, “আর মু‘আউয়িয়াহ হলো কপৰ্দকহীন গরীব মানুষ।” [প্রাগুক্ত]
.
৪র্থ বক্তব্য,
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, একজন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসার অনুমতি চাইল। তিনি বললেন, ‘‘ওকে অনুমতি দাও। ও নিজ বংশের অত্যন্ত মন্দ ব্যক্তি।’’
📚 [ সহীহুল বুখারী ৬০৩২, ৬০৫৪, ৬১৩১, মুসলিম ২৫৯১, তিরমিযী ১৯৯৬, আবূ দাউদ ৪৭৯১, ৪৭৯২, আহমাদ ২৩৫৮৬, ২৩৯৮৪, ২৪২৭৭, ২৪৭২৬, ২৪৮৭৮, মুওয়াত্তা মালিক ১৬৭]
উল্লেখ্য যে, কোন ব্যক্তি বিশেষ দ্বারা যদি সে ছাড়াও পরিবার,সমাজ, রাস্ট্র, উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেক্ষেত্রে কেবল তাকে একেলাই সংশোধন করাটা যথেষ্ট নয় বরং তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে যারা দিকভ্রান্ত হচ্ছে তাদেরকেও খোলাসা করে তার বিভ্রান্তির ব্যাপারে জানিয়ে দিতে হবে যাতে করে লোকেরা বিপথে চলে না যায়!
উপরিউক্ত হাদিসগুলো দ্বারা ইমাম বুখারী [রহঃ] ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী ও সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের গীবত করার বৈধতা প্রমাণ করেছেন।

Comments
Post a Comment
Welcome to my blog.